আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ: ২০২৪ সালের রাজনৈতিক সংকট ও এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব

অন্তর্বর্তী সরকার সম্প্রতি আওয়ামী লীগের কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এই নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকির দিকগুলো নিয়ে লিখেছেন ডেভিড বার্গম্যান

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ






২০০৮ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুনরায় ক্ষমতায় আসে। অনেকের বিশ্বাস ছিল, দলটি বিএনপির বিকল্প হিসেবে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ধারার নেতৃত্ব দেবে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই আশাবাদ নিরাশায় পরিণত হয়।

আওয়ামী লীগের শাসন: ১৫ বছরের রাজনৈতিক চিত্র

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের শাসনামলে নির্বাচনকে প্রভাবিত করা, বিরুদ্ধমত দমন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দলীয়করণ, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দৃশ্যমানভাবে বেড়ে যায়। যদিও পূর্ববর্তী সরকারগুলোর বিরুদ্ধেও এ ধরনের অভিযোগ ছিল, আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে এসবের মাত্রা ছিল নজিরবিহীন, যা একে কার্যত স্বৈরতান্ত্রিক রূপ দেয়।

দলের কিছু বিশেষ উদ্যোগ যেমন—গুমের প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের অতিরঞ্জিত মহিমামণ্ডন—সমালোচনার জন্ম দেয়।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট: রাজনৈতিক সহিংসতার অভূতপূর্ব নজির

২০২৪ সালের ১৬ জুলাই শুরু হওয়া ছাত্র আন্দোলন সরকার নির্মমভাবে দমন করে। আনুমানিক ১ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন। জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সহিংসতা ছিল সরকারের শীর্ষ মহলের নির্দেশে সংঘটিত একটি সংগঠিত দমনাভিযান।

৫ আগস্ট সেনাবাহিনী গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানালে সরকারের পতন ঘটে। এরপর থেকেই রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রে উঠে আসে একটি প্রশ্ন: আওয়ামী লীগকে কি নিষিদ্ধ করা উচিত?

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ ঘোষণা ও আইনি পদক্ষেপ

২০২৪ সালের আগস্টে সরকার ঘোষণা দেয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সকল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে। এই নিষেধাজ্ঞা অনুযায়ী—

  • দলটির পক্ষে বা সমর্থনে কোনো প্রচারণা নিষিদ্ধ

  • গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দলকে সমর্থন করে কিছু প্রকাশ করা অপরাধ

  • কোনো র‌্যালি, সভা বা জনসমাবেশ আয়োজন নিষিদ্ধ

কেন দলকে নিষিদ্ধ করা হলো?

আওয়ামী লীগ সরাসরি মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, দলীয় কর্মীরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দমনাভিযানে অংশ নিয়েছে। যদিও জাতিসংঘের রিপোর্ট সরাসরি দলটিকে দায়ী করেনি, তথাপি বলা হয়েছে—যারা সক্রিয়ভাবে এই দমনযজ্ঞকে সমর্থন করেছে, তারা দায় এড়াতে পারে না।

তবে দলের পক্ষ থেকে এখনো কেউ দুঃখপ্রকাশ বা আত্মসমালোচনা করেননি। বরং শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতারা জাতিসংঘের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করেছেন।

নিষেধাজ্ঞার রাজনৈতিক ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জ

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা কতটা ন্যায্য—এ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। দলটি বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরনো রাজনৈতিক শক্তি, যার শিকড় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ নিষেধাজ্ঞার ফলে লাখো সমর্থক তাদের রাজনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।

রাজনৈতিক অধিকার সংকোচন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হ্রাস ও ভয়ের সংস্কৃতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে, যা গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকেও প্রভাবিত করতে পারে। এমনকি, যারা আওয়ামী লীগ সমর্থক, তাদের শান্তিপূর্ণ কার্যক্রমও গ্রেপ্তারের ঝুঁকিতে পড়তে পারে।




নিষেধাজ্ঞার প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক ঘাটতি

এই সিদ্ধান্ত যে প্রক্রিয়ায় গৃহীত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ছাত্রনেতাদের চাপের মুখে দ্রুততম সময়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যেখানে জাতীয় পরিণতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত চিন্তা করা হয়নি। সরকারের যুক্তি—নিরাপত্তা ও ট্রাইব্যুনালের সাক্ষীদের রক্ষা—যথার্থ হলেও, এত কড়াকড়ি ছাড়াও বিকল্প উপায় ছিল।

সমাপনী বিশ্লেষণ: আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ—গণতন্ত্রের জন্য সুযোগ না বিপদ?

আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অভিযোগ গুরুতর—এতে সন্দেহ নেই। কিন্তু গণতন্ত্রের মৌলিক মূল্যবোধ, যেমন রাজনৈতিক বহুত্ববাদ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, এসব প্রশ্নকেও বিবেচনায় নিতে হয়। দলটিকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রকে প্রতিশোধমূলক ও একপক্ষীয় ধারায় ঠেলে দিতে পারে, যেখানে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আইনের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করা হয়।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা একটি সাহসী সিদ্ধান্ত হলেও, তা গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকারকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। এখন সময় এসেছে, এই সিদ্ধান্ত দেশের জন্য কী ফল বয়ে আনবে, তা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার।