বাংলাদেশে মব জাস্টিস: আইনের শাসনের চ্যালেঞ্জ ও বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্লেষণ
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টারা বারবার হুঁশিয়ারি দিলেও এখনো মব জাস্টিস বা 'উচ্ছৃঙ্খল জনতার বিচার' বন্ধ হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া বেশ কয়েকটি আলোচিত ঘটনায় দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ আইন নিজের হাতে তুলে নিচ্ছে। এতে করে শুধু সাধারণ মানুষ নয়, আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও আক্রান্ত হচ্ছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হত্যা ও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া
১৩ মে রাতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ছুরিকাঘাতে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের ছাত্র এবং ছাত্রদল কর্মী শাহারিয়ার আলম সাম্য। এই ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে সন্দেহভাজন হিসেবে গ্রেপ্তার করে — তামিম হাওলাদার, পলাশ সরদার ও সম্রাট মল্লিক। কিন্তু অভিযুক্তদের একজন তামিমের গ্রামের বাড়ি মাদারীপুরে পুড়িয়ে দেওয়া হয় একদল উগ্র জনতা দ্বারা, যেটি ছিল আইনবহির্ভূত ও মানবাধিকার লঙ্ঘন।
মব হামলা: পুলিশের নিজের নিরাপত্তাও হুমকির মুখে
বাংলাদেশ পুলিশ জানিয়েছে, অভ্যুত্থানের পর প্রতিদিন গড়ে একটির বেশি মব হামলার ঘটনা ঘটছে। ২০২৫ সালের মার্চে ৩৫টি এবং এপ্রিলে ৩৭টি হামলা হয়েছে শুধুমাত্র পুলিশের উপরেই। আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়ে পুলিশ সদস্যদের উপর ২২৫টি হামলা হয়, যার মধ্যে ৭০টি ছিল গুরুতর।
আইজিপি বাহারুল আলম বলেন, “এই পরিস্থিতি একা পুলিশের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।” হামলাগুলোর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, পুলিশ কাউকে গ্রেপ্তার করার পর জনতা সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ করছে।
রাজনৈতিক ও সামাজিক পটভূমি: মব তৈরি হচ্ছে কেন?
বিশ্লেষকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী ও পেশাদার অপরাধীরা মব গঠনে ভূমিকা রাখছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, “পুলিশ ঘুরে দাঁড়াতে গেলেই তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় না থাকলে এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতো না।”
গণপিটুনিতে মৃত্যু: ভয়াবহ বাস্তবতা
হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত গণপিটুনিতে অন্তত ১১৯ জন নিহত হয়েছেন। গত ১০ বছরে এ সংখ্যা ৭৯২ জনে পৌঁছেছে, যার মধ্যে ২০২৪ সালে সবচেয়ে বেশি ঘটেছে — ১৭৯টি মৃত্যু।
সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা ও সহিংসতা
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের সরকার পতনের পর সারাদেশে আওয়ামী লীগের সমর্থকদের বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, এমনকি সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা বেড়ে যায়। ৪৯টি জেলায় ১,০৬৮টি বাড়ি ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৫ থেকে ২০ আগস্টের মধ্যে।
মিডিয়া ও মব হুমকি: ‘সেল্ফ সেন্সরশিপ’ বাড়ছে
গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রধান কামাল আহমেদ বলেন, “সরকারি হস্তক্ষেপ কমলেও এখন গণমাধ্যম ‘মবের হুমকির’ কারণে আত্মনিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। এটা স্বাধীন সাংবাদিকতার জন্য হুমকি।”
সম্প্রতি আলোচিত কিছু মব হামলা:
-
৪ মার্চ বসুন্ধরায় দুই ইরানি নাগরিককে ছিনতাইকারী সন্দেহে মারধর করা হয়। পরে পুলিশ জানায় তারা নিরপরাধ।
-
২৯ এপ্রিল অভিনেতা সিদ্দিককে প্রকাশ্যে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, তাকে আওয়ামী লীগ-সংশ্লিষ্ট দাবি করে হামলা করা হয়।
-
৫ মে বগুড়ায় হোমিওপ্যাথিক কলেজের অধ্যক্ষ এস এম মিল্লাত হোসেনকে এনসিপি নেতাকর্মীরা আটকে রেখে মারধর করে পুলিশে দেন।
সরকারি প্রতিক্রিয়া: আইনের শাসন নিশ্চিতের অঙ্গীকার
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব ফয়েজ আহমেদ বলেন, “সরকারের লক্ষ্য মব নিয়ন্ত্রণে আনা। কিছু ঘটনা ঘটলেও পুলিশ ব্যবস্থা নিচ্ছে। আমরা স্বীকার করি পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি, তবে চেষ্টা চলছে অপরাধ শূন্যের কোটায় আনার।”
তিনি উদাহরণ দিয়ে জানান, গুলশানে আওয়ামী লীগ নেতার বাড়িতে টাকা লুকানো আছে এমন গুজবে তল্লাশি চালানো হয়। পরে সেই ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে।
উপসংহার: মব সংস্কৃতি রোধে প্রয়োজন কঠোর ও কার্যকর উদ্যোগ
বাংলাদেশে মব জাস্টিস এবং আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলায় শুধু পুলিশ নয়, সরকারের, রাজনৈতিক দলগুলোর, এবং নাগরিক সমাজেরও সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। রাজনৈতিক পক্ষপাত ও বিচারহীনতা কমিয়ে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হতে পারে এর একমাত্র সমাধান।

0 মন্তব্যসমূহ