আওয়ামী লীগ: নিষেধাজ্ঞা ও সংকটের দীর্ঘ ইতিহাসে ২০২৫ সালের মোড়

আওয়ামী লীগ





বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন ও বৃহৎ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ তাদের ৭৬ বছরের রাজনৈতিক যাত্রায় একাধিকবার রাজনৈতিক সংকট, নিষেধাজ্ঞা ও দমন-পীড়নের মুখোমুখি হয়েছে। তবে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আরোপিত সর্বশেষ নিষেধাজ্ঞা—যা ১০ই মে রাতে জারি হয়—তাদের ইতিহাসে অন্যতম গুরুতর ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

বর্তমান সংকট: গণ-আন্দোলনের ধাক্কায় পতন ও নিষিদ্ধ ঘোষণা

২০২৪ সালের জুলাই-অগাস্ট মাসে ছাত্র-জনতার নেতৃত্বে এক গণ-আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের মুখে পড়ে। আন্দোলন দমন করতে গিয়ে ‘গণহত্যা’র অভিযোগ উঠে শেখ হাসিনাসহ দলের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে।

সরকার পতনের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন এবং অনেক নেতাই পলাতক বা কারাগারে রয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার আওয়ামী লীগের সব রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির বিরুদ্ধে বিচার শুরু করে। দাবি উঠেছে, দলটিকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করার।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এবারের সংকট বহুমাত্রিক এবং গভীর।

আওয়ামী লীগ







ইতিহাসের ধারায় আওয়ামী লীগকে নিষ্ক্রিয় বা নিষিদ্ধ করার সাতটি বড় পর্ব

১. সামরিক শাসনের শুরুতে নিষিদ্ধ (১৯৫৮)

আওয়ামী লীগ ১৯৪৯ সালে "পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ" হিসেবে যাত্রা শুরু করে। ১৯৫৮ সালের ৭ই অক্টোবর আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের মাধ্যমে পাকিস্তানে রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করা হয়, যার আওতায় পড়ে আওয়ামী লীগও।
এই সময় দলটি কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে এবং নেতৃবৃন্দ গ্রেপ্তার হন।

২. ১৯৭১: রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা

২৫শে মার্চ রাতে "অপারেশন সার্চলাইট" শুরুর পর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রদ্রোহী ঘোষণা করে নিষিদ্ধ করেন।
এই সিদ্ধান্ত ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট। যুদ্ধকালীন সময় দলটি মুজিবনগর সরকার গঠন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করে।

৩. ১৯৭৫: বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড ও দলীয় বিপর্যয়

১৫ই আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগ এক গভীর রাজনৈতিক শূন্যতায় পড়ে।
খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে সরকার গঠিত হলে দলটি সাংগঠনিকভাবে অকার্যকর হয়ে পড়ে। একই বছরের ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে দলটির চার শীর্ষ নেতাকে হত্যার মাধ্যমে নেতৃত্বে ভয়াবহ সংকট দেখা দেয়।

৪. সামরিক শাসন ও গৃহবন্দিত্ব (১৯৮২–১৯৯০)

জেনারেল এরশাদের শাসনামলে রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়।
আওয়ামী লীগ সভা-সমাবেশ করতে না পারলেও ঘরোয়া পর্যায়ে কার্যক্রম চালায়। শেখ হাসিনাকে একাধিকবার গৃহবন্দি করা হয়।
আন্দোলনের মাধ্যমে ১৯৯০ সালে এরশাদ পতনের পর দলটি আবার সক্রিয় হয়।

৫. বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে সহিংসতা ও দমন (২০০১–২০০৬)

২০০১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী এবং সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা চালানো হয়।
দলীয় কার্যালয়ে হামলা, নেতাকর্মীদের হয়রানি ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ব্যাপকভাবে ঘটে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।

৬. তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে দমন (২০০৭–২০০৮)

২০০৭ সালে সেনা-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন হলে আওয়ামী লীগসহ সব দলের রাজনৈতিক কার্যক্রমে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়।
শেখ হাসিনাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলার আওতায় তাকে রাজনীতি থেকে সরিয়ে দিতে চেষ্টাও হয়।
২০০৮ সালের নির্বাচনে বিজয়ের মাধ্যমে দলটি আবার সরকার গঠন করে।

৭. ২০২৫: গণ-আন্দোলনের পর নিষিদ্ধ ঘোষণা

২০২৪ সালের গণ-আন্দোলনের জেরে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
শেখ হাসিনাসহ নেতাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা ও দুর্নীতির অভিযোগে বিচার চলছে। বিভিন্ন ইসলামপন্থী দল ও নাগরিক সমাজ থেকে দলটির স্থায়ী নিষিদ্ধের দাবি উঠেছে।


ভিন্ন প্রেক্ষাপটে পুরনো ইতিহাস

পূর্বের নিষেধাজ্ঞাগুলোর বেশিরভাগই সামরিক শাসন কিংবা কর্তৃত্ববাদী শাসনের সময় রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণমূলক উদ্যোগ হিসেবে এসেছিল।
কিন্তু ২০২৫ সালে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়েছে সাধারণ মানুষের গণ-আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে এবং গণহত্যার অভিযোগের ভিত্তিতে—যা আগে কখনও হয়নি।

রাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, আওয়ামী লীগের ইতিহাসে এবারের নিষেধাজ্ঞা একেবারে ভিন্ন ও গুরুতর। এবার তারা কেবল নিষ্ক্রিয় নয়, বরং অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দায়ে বিচারের মুখোমুখি।


উপসংহার

আওয়ামী লীগের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায়, দলটি প্রতিটি সংকট থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়েছে—কখনও সংগঠিতভাবে, কখনও নেতৃবৃন্দের শক্তিশালী নেতৃত্বে।
তবে ২০২৫ সালের নিষেধাজ্ঞা এক অনন্য নজির, যা শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, আইনি ও নৈতিক প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে দলটিকে।

এবার আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু রাজনীতিতে পুনরায় ফিরে আসার সক্ষমতার ওপর নয়, বরং বিচারের রায়, জনগণের মনোভাব এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ওপরও।